পরীক্ষা না দিয়েই পাস: সিস্টেম এ্যানালিস্টসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ

1,088
Print Friendly, PDF & Email

মহিলা মাদ্রাসার নামে পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। আর অর্থের বিনিময়ে ‘ভুয়া শিক্ষার্থীদের’ পাস করাতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একটি চক্র রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। তারা নবম শ্রেণিতে ভুয়া নাম ঠিকানায় কিছু শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে রেখে দুই বছর পর পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগে রাতারাতি সেই সব নাম-ঠিকানা পাল্টে দিচ্ছেন। এছাড়া ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর মতো অবিশ্বাস্য অনিয়মও পাওয়া গেছে।  জাল-জালিয়াতির পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিতে বোর্ডের কম্পিউটার থেকে সব ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনা ধরা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. আল আমিন হোসেন। ২০১৪ সালে পাবনার বেড়ার একটি মাদ্রাসা থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে নবম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে এই নামটি নিবন্ধিত (নম্বর ৫৫১১৮৫) হয়। কিন্তু এই নিবন্ধন নম্বরে ২০১৬ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষা দিয়ে যিনি ৪.৩২ জিপিএ পেয়ে পাস করেছেন তিনি আল আমিন নন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর নাম মো. আসিক রহমান (কাদের)। তাহলে আল আমিন কোথায় গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোনোর মতোই বেরিয়ে এসেছে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য। শিক্ষার্থী নিবন্ধন নিয়ে একটি দুষ্টচক্রের সন্ধান মিলেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই ‘পাস’ করা যাচ্ছে এ বোর্ড থেকে। পাওয়া যাচ্ছে সনদও। এর জন্য কেবল মোটা অঙ্কের টাকা গুনলেই চলে। ২০১৬ সালের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষাতেই এমন ১৫ শিক্ষার্থীর সন্ধান মিলেছে।

জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাদ্রাসা) একেএম জাকির হোসেন ভঁূঞা ও উপসচিব (কারিগরি) সুবোধ চন্দ্র ঢালী গত দুই মাস ধরে তদন্ত চালিয়ে এই জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করেন।

তারা এ ঘটনার জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, সচিব নায়েব আলী মণ্ডলসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। গত সপ্তাহেই ওই তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও সচিব মো. আলমগীরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটির ৪০৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে আট ধরনের জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো_ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড একজনের পরিবর্তে অন্যজনকে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র নয় এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান রেজিস্ট্রেশনের জন্য নাম পাঠাননি, তবু বোর্ড এমন ছাত্রদের নাম রেজিস্ট্রেশন করেছে, একই রোল ও রেজিস্ট্রেশনের বিপরীতে একাধিক নামে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে, এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ফল জালিয়াতির মাধ্যমে পাস করানো হয়েছে, নবম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলেও ৪.২৩ জিপিএ দেখিয়ে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে এবং নিয়ম না থাকলেও তিন বিষয়ের অধিক বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও দশম শ্রেণিতে তোলা হয়েছে।

জালিয়াতি যেভাবে :পাবনার বেড়া উপজেলার বেড়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার নামে ২০১৬ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ৬ শিক্ষার্থীকে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। দুই সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি তদন্ত শুরু করার পর একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হতে থাকে। তদন্তকালে শুধু এই একটি পরীক্ষাতেই এমন ১৫ জন ভুয়া শিক্ষার্থীর সন্ধান মেলে, যারা পরীক্ষা না দিয়েই পাস করে গেছে। তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা বোর্ডের কাছে চাওয়া হলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত কমিটিকে দিতে পারেনি। যদিও রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থীদের এসব তথ্য তাদের কাছে থাকার কথা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে থেকেই ভুয়া নামে কিছু শিক্ষার্থীর নাম রেজিস্ট্রেশন করে রাখা হয়েছিল। ভুয়া শিক্ষার্থী হওয়ায় সঙ্গত কারণেই তারা নবম শ্রেণির বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি, পরীক্ষায় অংশও নেয়নি। কেন্দ্র্রেও তাদের কোনো হাজিরা শিট বা পরীক্ষা দেওয়ার চিহ্ন নেই। তারপরও তারা ২০১৬ সালে এসএসসি (ভোক) ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। ফলাফলে তাদের পাসও দেখানো হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সেই রিপ্লেস জালিয়াতির কারণে। এমন অনেকের মধ্যে ছয় ছাত্রের তালিকা, মার্কশিট সমকালের হাতে এসেছে। সূত্র মতে, কারিগরি বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতিতে সক্রিয় একটি চক্র। তারাই ভুয়া নামে রেজিস্ট্রেশন করে রাখে। এসএসসির সার্টিফিকেট প্রয়োজন এমন লোকজনের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়। পরে ওই ভুয়া রেজিস্ট্রেশনে রিপ্লেস করে চাহিদা মাফিক ব্যক্তির নাম বসিয়ে দেওয়া হয়। এ ছয়জনের নবম শ্রেণির ভুয়া রোল নম্বর হলো-৬৬২৮৪৭, ৭৫৮৭৫৮, ৬৬২৮৯০, ৭৫৮৭৫৭, ৭৫৮৭৬২ ও ৭৫৮৮০৭। রেজিস্ট্রেশন নম্বর হলো- ৫৫১১৮৫, ৮৯০২২৭, ৫৫১১৭২, ৮৯০২২৬, ৮৯০২৩৩ ও ৮৯০২৩২। প্রত্যেকেরই সেশন ২০১৪। তাদের এসএসসি ২০১৬-এর রোল হলো-৬৬২৮৪৭, ৭৫৮৭৫৮, ৬৬২৮৯০, ৭৫৮৭৫৭, ৭৫৮৭৬২ ও ৭৫৮৮০৭। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকে ছাত্র হলেও তাদের রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস করতে গিয়ে একটি মহিলা মাদ্রাসার নামে করা হয়েছে। এটি হলো পাবনার বেড়া মহিলা ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা।

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসএসসিতে ৭৫৮৭৫৮ রোল নম্বরের শিক্ষার্থীর নাম আমির হামজা। পিতার নাম ওয়াজেদ আলী। মাতা মোছা. জামিলা খাতুন। তার গ্রুপ দেখানো হয়েছে কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাকে নিয়মিত ছাত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। রেজাল্টশিটে দেখা যায়, আমির হামজা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং বিষয়ে ‘এ’ পাস মার্ক পেয়েছে। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট ট্রেনিং ও ফিজিক্যাল এডুকেশনেও পেয়েছে ‘এ’। আর ধর্ম, এগ্রিকালচার, বাংলা, ইংরেজি, অঙ্কসহ অন্য বিষয়ে পেয়েছে এফ-৯। রেজাল্টশিটে একই রোল নম্বরধারী দেখানো হয়েছে কালাম হোসেন নামে একজনকে। তার পিতার নাম ওয়াজেদ আলী। মাতার নাম আমিনা বেগম। তার গ্রুপ দেখানো হয়েছে কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাকেও নিয়মিত ছাত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। ৭৫৮৭৬২ রোল নম্বরের শিক্ষার্থীর নাম সুমন হোসেন। পিতা মুলুক চাঁন ও মাতা শুকুরুন্নেসা। তাকেও একই গ্রুপের নিয়মিত ছাত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। সুমন হোসেনকে ৪.১৪ পেয়ে পাস দেখানো হয়েছে। ৬৬২৮৪৭ রোল নম্বরের নাম আশিক রাইমান। তার পিতার নাম দেখানো হয়েছে আমির হোসাইন। মাতা জুলেখা খাতুন। সেও একই গ্রুপ থেকে পরীক্ষা দেয়। আশিক একটি বিষয়ে ‘বি’ মাইনাস ও একটি বিষয়ে ‘এ’ পেয়েছে। অন্য সব বিষয়ে তাকে দেখানো হয়েছে এফ-৯। ৬৬২৭৯০ রোল নম্বরধারীর নাম আতিক হাসান। পিতা আমোদ আলী, মাতা আলো খাতুন। সেও একই গ্রুপ থেকে পরীক্ষা দেয়। আতিক একটি বিষয়ে ‘এ’ মাইনাস ও একটি বিষয়ে ‘এ’ পাস মার্ক পেয়েছে। অন্য সব বিষয়ে পেয়েছে এফ-৯। তদন্তকালে দেখা গেছে, এসব ছাত্রের বর্তমান বয়স ৩৬ থেকে ৩৭ বছর। যে প্রতিষ্ঠানের নামে তারা পরীক্ষা দিয়েছে সে প্রতিষ্ঠানের কোড নম্বর হলো-২৬১৩১। আবার দেখা গেছে, ৬টি প্রতিষ্ঠানের ভোকেশনালের অনুমতি নেই। অথচ ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠান কোড ১৬১২০ থেকে ২ জন, ১৮১২৮ থেকে ৮ জন, ২০২১৭ থেকে ৩০ জন, ২৫১৫৩ থেকে ১ জন, ৩৫১৫৭ থেকে ৩০ জন, ৫০০৬৫ থেকে একজন পরীক্ষা দিয়েছে।

সূত্র জানায়, ৫৫১১৮৫ নম্বর রেজিস্ট্রেশনধারীর নাম নবম শ্রেণিতে মো. আল আমিন হোসেন। অথচ এসএসসি ভোকেশনালে ভোজবাজির মতো আল আমিন হোসেন হয়ে যান মো. আসিক রহমান (কাদের)। তিনি এ নামে ৪.৩২ জিপিএ পেয়ে পাসও করেছেন। ৫৫১১৭২ নম্বর রেজিস্ট্রেশনধারী নবম শ্রেণিতে ছিলেন মো. আবদুল্লাহ। আর বোর্ড ফাইনালে তিনি মো. আতিক হাসান নামে ৪.১৮ জিপিএ নিয়ে এসএসসি ভোকেশনাল পাস করেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথম নামগুলো ভুয়া। দ্বিতীয় নামের ছাত্ররা টাকার বিনিময়ে বোর্ড থেকে এসএসসি সনদ ‘কিনে’ নিয়েছেন।

সার্টিফিকেট কেনা ভুয়া শিক্ষার্থী কারা :বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল বেড়া বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধানই উলি্লখিত শিক্ষার্থীরা তাদের নয় এবং তাদের কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন। তদন্তকালে ভুয়া ১৫ শিক্ষার্থীর আটজনের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, তারা প্রত্যেকে বেড়ার পার্শ্ববর্তী উপজেলা শাহজাদপুরের। তারা হলেন_ মো. আশিক রহমান কাদের, গ্রাম জিগারবাড়িয়া, ডাকঘর নগরচালা, উপজেলা শাহজাদপুর, জেলা সিরাজগঞ্জ, একই উপজেলার মো. আতিক হাসান, গ্রাম চর বেলতৈল, ডাকঘর বেলতৈল, মো. কালাম হোসেন, গ্রাম রানীকোলা, ডাকঘর পোরজোনা; মো. আমির হামজা, গ্রাম মূলকান্দি টোকপাড়া, ডাকঘর বেলতৈল; সুমন হোসাইন, গ্রাম লোচনাপড়া, ডাকঘর বেলতৈল; আসাদুজ্জামান, গ্রাম পান্নাতপুর, ডাকঘর শাহজাদপুর; মুনজিলা খাতুন, গ্রাম তালগাছি, ডাকঘর শাহজাদপুর এবং মোছাম্মত কশী, গ্রাম পোতাদিয়া, ডাকঘর পোতাদিয়া।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা বলেন, বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার ভর্তি রেজিস্ট্রার, নিয়মিত বেতন বই পরীক্ষা করেও এই নামে কোনো শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব মেলেনি। মাদ্রাসার সুপারও দাবি করেন, এরা তার শিক্ষার্থী নন। তিনি তাদের নাম রেজিস্ট্রেশন করতেও পাঠাননি বোর্ডে। এরপরও তাদের এই মাদ্রাসার নামে রেজিস্ট্রেশন দেখিয়ে পাস করিয়ে সনদ দেওয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেড়া মহিলা ফাজিল মাদ্রাসায় ২০১৪ সালে ভর্তি হয়েছিল ১২৩ শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষার্থীরা ২০১৪ সালে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ওই ১২৩ জনের নাম বোর্ডে রেজিস্ট্রেশনের জন্য পাঠালেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিষ্ঠানের নামে রেজিস্ট্রেশন করেছে ১৪১ শিক্ষার্থীকে। অর্থাৎ বাকি ১৮ জনই ভুয়া। যা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানতোই না। পরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাঠানো ১২৩ জনের মধ্য থেকে আবার ৭ জনের নাম বাদ দিয়ে নতুন ৭ জনের নাম ঢুকিয়েছে বোর্ডের কম্পিউটার শাখা। এতে ভুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ জনে। ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১১৬ শিক্ষার্থী দশম শ্রেণিতে উঠলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ দশম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন দেখিয়েছে ১২২ জন। আর বোর্ড ফাইনালে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ৭২ জনের নাম পাঠালেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ দেখিয়েছে ৮২ জন। এভাবে রেজিস্ট্রেশনের প্রতিটি স্তরে জালিয়াতি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আবদুস সালাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে এমন ভুয়া শিক্ষার্থী পাস করে যাচ্ছে, অথচ আমরা কিছুই জানতাম না! তদন্ত শুরু হওয়ায় আমরা খুব বিপদে আছি। সবাই জানতে চায় কীভাবে এমন হলো? এর জবাব তো দিতে পারবে কারিগরি বোর্ড। মাঝখান থেকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।

দায়ী কারা :জাল-জালিয়াতির এ ঘটনার মূল হোতা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার শাখার সিস্টেম এনালিস্ট একেএম শামসুজ্জামান ও সহকারী সিস্টেম এনালিস্ট হাসান ইমাম। তাদের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন আরও তিন কর্মকর্তা। তারা হলেন_ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সুশীল পাল, উপসচিব (রেজিস্ট্রেশন) নূর এ এলাহী এবং ওরাকল স্পেশালিস্ট (কম্পিউটার শাখা) ওমর ফারুক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এ পাঁচজন ছাড়াও দায়িত্বে চরম অবহেলা ও গাফিলতির জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বোর্ড সচিব নায়েব আলী মণ্ডলকে দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেজিস্ট্রেশনের পুরো বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব সচিবের হলেও তিনি তা যথাযথভাবে করতে সমর্থ হননি।

অভিযুক্তদের বক্তব্য :বোর্ড চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি তদন্ত প্রতিবেদনটি দেখেননি। আর রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি পরীক্ষা শাখা ও কম্পিউটার শাখার কাজ। তবে কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্ট বাড়াতে মহিলা মাদ্রাসায় ভোকেশনালে পুরুষ শিক্ষার্থী নেওয়া হয়। এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেই করা হয়েছে। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির ঘটনা তিনি ধামাচাপা দেননি বরং মন্ত্রণালয়ের নজরে এনেছেন। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর তিনি যদি কোনো বিলম্ব করতেন তাহলে তিনি হয়তো দায়ী হতে পারতেন। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রণালয় এখন যেভাবে নির্দেশ দেবে তা প্রতিপালন করা হবে।

বোর্ডের সচিব নায়েব আলী মণ্ডল যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, যারা তদন্ত করেছে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। কর্মবণ্টন বলে সরকারি চাকরিতে একটি জিনিস আছে। কার কী দায়িত্ব তা নির্ধারণ করা আছে। কনস্টেবল ঘুষ খেলে এসপিকে দায়ী করার মতো সুপারিশই তদন্ত প্রতিবেদনে করা হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সুশীল পাল বলেন, তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে ইচ্ছুক নন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত করেছে, তারাই ব্যবস্থা নেবে। তবে সিস্টেম এনালিস্ট একেএম শামসুজ্জামান দাবি করেন, তার সবকিছু মনে নেই। এটা ২০১৪ সালের ব্যাপার। এতো আগের কাগজপত্র সব বোর্ডে সংরিক্ষতও নেই। তিনি জানান, এনরোলমেন্ট বাড়াতে তারা নানা কিছু করে থাকেন। এটা করতে গিয়ে ছাত্র বাড়ানোর কৌশল হিসেবে তারা নবম, দশম শ্রেণি এমনকি পরীক্ষার আগে পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন করে থাকেন। আবার অনেক শিক্ষার্থী ঝরে যায়। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পাঠানো আবেদনের ভিত্তিতেই তা করা হয়। ‘এমন কোনো আবেদন দেখাতে পারবেন কি না’_ জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

তথ্য ‍সূত্রঃ দৈনিক শিক্ষা..