মাইক্রোসফটে বিল গেটস যুগের অবসান

870
Print Friendly, PDF & Email

মাইক্রোসফট ও বার্কশয়ার হাথওয়ের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিল গেটস। জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে আরও বেশি নিয়োজিত করতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গেটস। ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী, বিল গেটস বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধনী। তার আগে আছেন কেবল আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। গেটসের সম্পদের পরিমাণ ১০৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার…

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের জীবন কেটেছে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ না করেই মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করা, বিশ্বের সেরা ধনী ব্যক্তির আসনে ওঠা এবং দানশীল হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন তিনি। কিন্তু একসময়ের কঠোর ব্যবস্থাপক, দুর্দান্ত চিন্তক বিল গেটস কিন্তু খাবার শেষে নিজের প্লেট নিজে ধোয়ার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পান। সম্প্রতি মাইক্রোসফট ও বার্কশয়ার হাথওয়ের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিল গেটস। এর মধ্যদিয়ে মাইক্রোসফটে বিলগেটস যুগের অবসান হতে যাচ্ছে। যদিও জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে আরও বেশি নিয়োজিত করতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গেটস। ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী, বিল গেটস বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধনী। তার আগে আছেন কেবল আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। গেটসের সম্পদের পরিমাণ ১০৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিল গেটস (৬৫) মানবহিতৈষী হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দাতব্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার কাজের প্রভাব পড়ছে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের ওপর। এ কাজকে আরও এগিয়ে নিতে চান তিনি। তাই ছেড়ে দিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে রাখা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পদ। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইক্রোসফটের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিল গেটস। এতে তিনি আরও বেশি সময় দাতব্য কর্মকান্ডে দিতে পারবেন। বিল গেটস বলেছেন, তিনি এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন, শিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। তবে পদ ছাড়লেও মাইক্রোসফটের কাছাকাছিই থাকবেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মাইক্রোসফট আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোম্পানির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সত্য নাদেলার উপদেষ্টা হিসেবে টেকনিক্যাল টিমের সঙ্গে কাজ করে যাব। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে গেটস মাইক্রোসফটের বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেন। তবে নাদেলার উপদেষ্টা হিসেবে কোম্পানির সাফল্য ধরে রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন।
সিদ্ধান্ত নিয়ে গেটসের সহায়তার কথা উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে সত্য নাদেলা বলেন, আমাদের পরিচালনা পর্ষদ বিল গেটসের নেতৃত্ব থেকে অনেক লাভবান হয়েছে। মাইক্রোসফটের সেবাকে আরও উন্নত করতে আমরা ভবিষ্যতেও বিলের পরামর্শ পেতে থাকব।

অন্যরকম গেটস

বিল গেটস খুব মজার মানুষ। সাধারণের সঙ্গে মিশতেই তিনি পছন্দ করেন।

১৯৮০ সালের শেষ দিকে বিল গেটস ও পল অ্যালেন সান ফ্রানসিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেরি করে পৌঁছানোর কারণে ফ্লাইট মিস করেন। ইতিমধ্যেই বিমান যাত্রা শুরু করেছিল। বিল গেটস নাছোড়বান্দা। তিনি বিমানবন্দরে নিয়ন্ত্রণকক্ষে ঢুকে পড়েন ও সেখানে বিভিন্ন বাটন টিপে প্লেনটিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। অ্যালেন ভেবেছিলেন গেটস বুঝি আজ পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যাবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত এয়ারলাইনসের কেউ একজন বিমানটিকে ফিরিয়ে এনে তাদের জন্য যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিশোর বেলায় বিল গেটস কিন্তু একেবারেই শান্তশিষ্ট ছিলেন না। স্কুলে পড়ার সময় তার পছন্দের সব মেয়েকে এক ক্লাসে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। কিশোর বিল গেটসকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কম্পিউটার ব্যবহার করে একটি ক্লাস শিডিউল তৈরি করে দিতে বলেছিল। এই সুযোগ কাজে লাগান তিনি। তার পছন্দের সব মেয়েকে দিয়ে নিজের ক্লাসে নিয়ে আসেন। এখনো প্রতিরাতে নিজ হাতে থালা-বাসন ধুয়ে রাখেন বিল গেটস! বিল গেটস বলেন, ‘প্রতিরাতে আমি ডিশগুলো ধুয়ে থাকি, আমি এটা নিজের মতো করে করতে পছন্দ করি।’

মাইক্রোসফটের ব্যর্থতা

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস জানিয়েছেন তার ব্যর্থতার কথাও। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল আর ব্যর্থতার বিষয়টি এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর সেই ভুলটি ছিল অ্যান্ড্রয়েডের সঙ্গে পেরে না ওঠা। অ্যাপলের আইওএস প্লাটফর্মের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে তিনি অ্যান্ড্রয়েডের উঠে আসাকে ঠেকাতে পারেননি। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ভিলেজ গ্লোবালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিল গেটস তার ব্যর্থতার কথাটি স্বীকার করেন। মাইক্রোসফট যেভাবে গুগলের কাছে হেরেছে, সে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তার ব্যর্থতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। বিল গেটস বলেন, ‘সফটওয়্যারের দুনিয়ায় বিশেষ করে প্লাটফর্ম হিসেবে বিজয়ীরা সব বাজার দখল করতে পারে। অ্যান্ড্রয়েড আজ যে অবস্থানে আছে, মাইক্রোসফটকে সেখানে নিতে পারিনি। অ্যাপল বাদে মোবাইল প্লাটফর্মের জন্য অ্যান্ড্রয়েড এখন মানদ- হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যাপলবিহীন অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে মাত্র একটির জন্য জায়গা খালি আছে।’

মানব সেবাই ছাড়ার কারণ

মানব সেবায় নিজেকে আরও বেশি নিয়োজিত করার জন্যই মাইক্রোসফটের পরিচালকদের বোর্ড থেকে সরে দাঁড়ালেন বিল গেটস। বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটস বলেন, বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়ন, শিক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তিনি আরও কাজ করতে চান। ২০০৮ সাল থেকেই মাইক্রোসফটের কাজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত জড়িত থাকতেন বিল গেটস। তবে এখন থেকে তাকে আর সেভাবে দেখা যাবে না। ফোর্বস ম্যাগাজিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০৩. ৬ বিলিয়ন ডলার নিয়ে বিশ্বের ধনীদের তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন বিল গেটস। প্রথম অবস্থানে আছেন আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। তার প্রতি সেকেন্ডে আয় ৩৮০ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৩২ হাজার। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার নিট সম্পদের মূল্য ছিল ১০৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি বিজনেস ইনসাইডার বিল গেটসের আয় নিয়ে মজার কিছু তথ্য বের করেছে। সেখানেই এমন তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়াও আরও অনেক তথ্য রয়েছে। একজন আমেরিকান সারা জীবনে গড়ে আয় করেন ২২ লাখ ডলার। আর বিল গেটস মাত্র দেড় ঘণ্টায় আয় করেন এ টাকা। এখন বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনকেই বেশি সময় দেবেন তিনি।