স্বপ্নের পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন আজ!

সাড়ে ৭ বছরে পদ্মা সেতুতে কাজ করেছেন ১৪ হাজার শ্রমিক-প্রকৌশলী।

124
Print Friendly, PDF & Email

আজ ২৫ জুন ২০২২ সাল, সকাল ১০ টা ১২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধন করবেন। একটু পরেই হেলিকাপ্টার ও পরে মটর শোভাযাত্র সহকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাবেন সেতুর উত্তর প্রান্তের মাওয়ায় । সেখানে শুরুতেই শুধী সমাবেশ। মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশে ভাষণ শেষে তিনি উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন। অমনি খুলে যাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অপরাপর অংশের জন্য সংযোগ, যোগাযোগ এবং সম্ভাবনার অনন্ত দুয়ার।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু। মাওয়া থেকে জাজিরা। পদ্মা সেতু সড়ক, রেল, গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ ঘটাবে উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের। নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে আছে সংযোগ সড়ক, রেলসংযোগ, নদীশাসন, পুনর্বাসন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা—নানা প্রকল্প ও কর্মকাণ্ড।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সেতুটির নির্মাণ শেষ হতে সময় লেগেছে ৯০ মাস ২৭ দিন কিংবা ২ হাজার ৭৬৫ দিন কিংবা ৭ বছর ৬ মাস ২৭ দিন। দিনরাত কাজ করেছেন প্রায় ১৪ হাজার দেশি-বিদেশি শ্রমিক, প্রকৌশলী ও পরামর্শক। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০০ দেশি প্রকৌশলী, দুই হাজার ৫০০ বিদেশি প্রকৌশলী, প্রায় ৭ হাজার ৫০০ দেশি শ্রমিক, আড়াই হাজার বিদেশি শ্রমিক এবং প্রায় ৩০০ দেশি-বিদেশি পরামর্শক কাজ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২২ জুনের সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২১ জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৭ হাজার ৭৩২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এই টাকা বাংলাদেশের মানুষ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়াই যায়, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’

পদ্মা সেতু নির্মাণের সুফল আসবে নানাভাবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তা বিরাট অবদান রাখবে। ট্রান্সএশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ দেশের সঙ্গে ভারত, ভুটান ও নেপালের যোগাযোগ নিবিড় হবে। মোংলা বন্দর হবে রাজধানীর নিকটতম সমুদ্রবন্দর। এক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) বৃদ্ধি করবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর আগের আর পরের উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য থেকেই এই আশা বাস্তব ভিত্তি পায়।

১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতুর প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার কাজ শুরু করে। এরপর সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) হয়েছে, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২২ জুনের সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতুকে অগ্রাধিকার তালিকায় যুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকার।

২০১১ সালে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে অর্থায়ন বন্ধ করে। বাকি দাতা সংস্থাগুলোও পিছিয়ে যায়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যেই গড়ে তুলবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। উন্নয়ন–সহযোগীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, তাদের অর্থায়নের দরকার নেই।

সেতুর মূল কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের শেষের দিকে। এই সেতু বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি বহু বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ, প্রতিষ্ঠান, কারিগর, কয়েক হাজার শ্রমিক দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। জামিলুর রেজা চৌধুরী, এম শামীম জেড বসুনিয়া, আইনুন নিশাত, এ এম এম সফিউল্লাহ, এম ফিরোজ আহমেদের মতো দেশি বিশেষজ্ঞরা সর্বক্ষণ পরামর্শ দিয়েছেন, মানের প্রশ্নে একচুলও ছাড় দেননি। তেমনি পুনর্বাসনের কাজ, পরিবেশ রক্ষা কিংবা বনায়নের কাজও হয়েছে বিশ্বমানের। বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারির ধাক্কাও কাজের গতি মন্থর করতে পারেনি। এই প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তারাও দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।